পাওলা দিবালা —নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক সৃজনশীল ফুটবলারের ছবি। যিনি মাঠে কখনও শিল্পীর মতো বল পায়ে নাচান, আবার কখনও গোল করে দলকে জেতান অবিশ্বাস্য ম্যাচ। তবে দিবালার ক্যারিয়ারকে ঘিরে সবসময় একটি প্রশ্ন ছিল—তিনি কি ভুল সময়ে জন্মেছেন? কারণ তার যুগেই ফুটবলের আকাশে রাজত্ব করেছেন লিওনেল মেসি।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি এক আবেগ, এক ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের সময়েই জন্ম নেওয়া দিবালার জন্য ছিল আশীর্বাদও, আবার কিছুটা দুর্ভাগ্যও। কারণ প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় দলে তিনি কখনও নিজের পূর্ণ জায়গা তৈরি করতে পারেননি। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক বলেন, “দিবালা অন্য কোনো দেশের হয়ে খেললে হয়তো আজ কিংবদন্তি হয়ে যেতেন।”
১৯৯৩ সালের ১৫ নভেম্বর আর্জেন্টিনার ছোট শহর লাগুনা লার্গায় জন্ম নেওয়া দিবালা খুব ছোট বয়স থেকেই ফুটবলের প্রতি অসাধারণ টান অনুভব করেন। তার খেলার স্টাইল ছিল আলাদা—বাম পায়ের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, ছোট জায়গায় ড্রিবল এবং দুর্দান্ত ফিনিশিং। কৈশোরেই তিনি যোগ দেন আর্জেন্টাইন ক্লাব ইনস্টিটিউটোর একাডেমিতে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার বড় হওয়ার গল্প।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ঘটে দিবালার। তখন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এই ছেলের মধ্যে বিশেষ কিছু আছে। ইউরোপের স্কাউটরা তার দিকে নজর দিতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ইতালিয়ান ক্লাব Palermo তাকে দলে ভেড়ায়। সিরি আ’তে এসে দিবালা নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেন।
পালের্মোর জার্সিতে তার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। দ্রুত গতি, বুদ্ধিদীপ্ত পাস এবং গোল করার ক্ষমতা তাকে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে নিয়ে আসে। ২০১৫ সালে ইতালির অন্যতম সফল ক্লাব Juventus দিবালাকে দলে নেয়। এখান থেকেই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু।

জুভেন্টাসে এসে দিবালা যেন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। কিংবদন্তি ফুটবলার Alessandro Del Piero-এর সঙ্গে তুলনা শুরু হয় তার। একের পর এক গোল, অ্যাসিস্ট এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে তিনি হয়ে ওঠেন ক্লাবের অন্যতম ভরসার নাম। বিশেষ করে ২০১৭ মৌসুমে তার পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ।
কিন্তু ক্লাব ফুটবলে সফল হলেও জাতীয় দলে গল্পটা ছিল ভিন্ন। কারণ আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে তখন রাজত্ব করছেন মেসি। দুজনের খেলার ধরনে অনেক মিল থাকায় কোচদের জন্য তাদের একসঙ্গে খেলানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দিবালা নিজেও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “মেসির সঙ্গে একই পজিশনে খেলি বলে জাতীয় দলে মানিয়ে নেওয়া কঠিন।”
এই কথাটিই আসলে দিবালার ক্যারিয়ারের বাস্তবতা তুলে ধরে। তিনি এতটাই প্রতিভাবান ছিলেন যে অন্য যেকোনো দলে সহজেই মূল একাদশে জায়গা পেতেন। কিন্তু মেসির উপস্থিতি তাকে অনেক সময় বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছে।
তবুও দিবালা কখনও অভিযোগ করেননি। বরং মেসির প্রতি সবসময় শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। তিনি জানতেন, মেসির মতো একজন ফুটবলারের যুগে জন্ম নেওয়া মানে একইসঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ দুটোই পাওয়া।
২০২২ সালের FIFA World Cup Qatar 2022 দিবালার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আসে। পুরো টুর্নামেন্টে খুব বেশি সময় মাঠে না পেলেও ফাইনালে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। Argentina national football team যখন টাইব্রেকারের চাপে, তখন দিবালা ঠান্ডা মাথায় গোল করে দলকে এগিয়ে রাখেন। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতে এবং দিবালাও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হন।
এই মুহূর্তটি যেন তার ক্যারিয়ারের প্রতীক। হয়তো তিনি পুরো আলোটা পাননি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিজের কাজটা ঠিকই করেছেন।
বর্তমানে দিবালা খেলছেন AS Roma-এর হয়ে। ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করলেও এখনও তার পায়ে সেই জাদু দেখা যায়। রোমার সমর্থকরা তাকে ভালোবেসে ডাকেন “লা জোইয়া”—অর্থাৎ “দ্য জুয়েল” বা রত্ন।
দিবালার ক্যারিয়ার আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সব প্রতিভা সবসময় সমান আলো পায় না। কখনও কখনও একজন অসাধারণ খেলোয়াড়ও আরেকজন মহাতারকার ছায়ায় ঢাকা পড়ে যান। কিন্তু তাতে তার মূল্য কমে না।
ফুটবল ইতিহাসে পাওলো দিবালা হয়তো মেসির মতো সর্বকালের সেরা হিসেবে পরিচিত হবেন না। কিন্তু তিনি সেই বিরল খেলোয়াড়দের একজন, যাদের খেলা দেখলে ফুটবলকে শিল্প মনে হয়।
অনেকেই বলেন, “দিবালা ভুল সময়ে জন্মেছেন।” কিন্তু অন্যভাবে দেখলে বলা যায়, তিনি এমন এক সময়ে জন্মেছেন, যখন ফুটবল বিশ্ব একসঙ্গে দুই অসাধারণ আর্জেন্টাইন প্রতিভাকে দেখার সুযোগ পেয়েছে। একজন ছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক, আরেকজন ছিলেন নিঃশব্দ শিল্পী।
আর সেই নিঃশব্দ শিল্পীর নামই—পাওলো দিবালা।

